কিন্তু নতুন প্রযুক্তি আশানুরূপ ফল দিচ্ছে না কৃষকদের। সরকারি প্রশিক্ষণ ও ভর্তুকিতে পাওয়া মেশিন ব্যবহার করেও সংরক্ষণাগারে টন টন পেঁয়াজ পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ও সংরক্ষণাগারের কাঠামোগত মান বজায় না থাকলে এয়ার ফ্লো প্রযুক্তি কার্যকর হয় না। এছাড়া পেঁয়াজ সংগ্রহের সময় পরিপক্বতা, শুকানোর পদ্ধতি এবং রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ আলাদা না করাও পচনের কারণ হতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় কৃষকদের ক্ষতি আরো বাড়বে এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে আগ্রহ কমে যেতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কৃষিসমৃদ্ধ মেহেরপুর জেলায় দেশী জাতের তাহেরপুরী, ভারতীয় সুখসাগর ও অন্যান্য বিভিন্ন জাতের পেঁয়াজের আবাদ হয়ে থাকে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। মোট উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার টন পেঁয়াজ। এসব পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কৃষকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে এয়ার ফ্লো পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। তবে সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত এ পদ্ধতি তেমন কার্যকর হচ্ছে না। সংরক্ষণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পেঁয়াজে পচন ধরছে, ফলে বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচও উঠছে না, বরং ঋণের বোঝা বাড়ছে।
কয়েকজন কৃষক জানান, উৎপাদনের পরপরই কম দামে বিক্রি না করে অল্প সময় সংরক্ষণ করে ভালো দামে বাজারজাত করার উদ্দেশ্য ছিল তাদের। এতে একদিকে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন, অন্যদিকে পেঁয়াজের আমদানিনির্ভরতা কমবে—এমনটাই আশা করেছিলেন তারা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিয়ে এয়ার ফ্লো পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হচ্ছে না। সংরক্ষণাগারেই পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচও উঠছে না, বরং লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার স্থানীয় কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা হলেও কার্যকর কোনো সমাধান পাননি বলে দাবি করেন তারা।
মুজিবনগর উপজেলার ভবেরপাড়া গ্রামের পেঁয়াজ চাষী আব্দুল আউয়াল জানান, কৃষি অফিসের পরামর্শে পাঁচ বিঘা জমির পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে একটি এবং নিজ উদ্যোগে আরো একটি মেশিন নেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় তার অনেক খরচ হয়েছে। আশা ছিল পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে খরচ উঠে লাভের মুখ দেখবেন। কিন্তু এখন পাঁচ বিঘা নয়, ১০ বিঘা জমির পেঁয়াজ আবাদের সমান ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
মুজিবনগর উপজেলার রামনগর ইউপি সদস্য ও কৃষক সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রশিক্ষণ নিয়ে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করেও তার পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। এ কৃষক চার বিঘা জমির প্রায় সাড়ে চারশ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছিলেন। প্রতি মেশিনে ৩০০ মণ করে পেঁয়াজ রাখা গেলেও তিনি ২৫০ মণের কম রেখেছিলেন। কিন্তু তার পরও পেঁয়াজের পচন থামাতে পারেননি।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সনজীব মৃধা বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি যাতে কৃষকরা এক-দুই মাস তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারেন। দেশী পদ্ধতির পাশাপাশি বিগত বছর থেকে স্বল্প আকারে সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। প্রণোদনা প্রকল্পের আওতায় এসব মেশিন দেয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সংরক্ষণের বিষয়ে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। নতুন এ প্রযুক্তি কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং তারা যাতে তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, সে লক্ষ্যে কাজ করছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আশা করা যায়, এ প্রযুক্তি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে এবং কৃষকরা তাদের পেঁয়াজ আরো কিছুদিন সংরক্ষণ করতে পারবেন।’
এ পদ্ধতি ব্যবহারের পরও পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু মেশিনটি নতুন, তাই এর ব্যবহারে কৃষকদের দক্ষতা প্রয়োজন। এছাড়া বিদ্যুৎ সমস্যাসহ নানা কারণে পেঁয়াজে পচন ধরতে পারে।’ তবে মেশিনের মান ভালো বলেও দাবি করেন তিনি। তার মতে, পেঁয়াজ উৎপাদনের সময় এক মাসের মধ্যে সার প্রয়োগ, বৃষ্টি ও অন্যান্য কারণেও পেঁয়াজ পচে যেতে পারে। তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন এবং আশা করছেন দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।